ডা. কে কে কুন্ডু








ডা. কমল কৃষ্ণ কুন্ডুকে চাটমোহরের আর আট দশজনের মত আমিও চিনি ডা. কে কে কুন্ডু নামে। লোকমুখে শুনে উনার সম্পর্কে এতটুকু জানি যে, উনি খুব ভালো একজন ডাক্তার, চাটমোহরে উনি অনেক দান করেন, আমার বাড়ির পাশে বোঁথড় চড়কবাড়িতে চমৎকার মন্দির হয়েছে উনার অর্থায়নে। কিন্তু লোকমুখে শোনা এই কথাগুলো আমার কাছে আলাদা গুরুত্ব তৈরী করেনি। ঢাকার নিউ মার্কেটে এক সন্ধ্যায় উনি হুট করে আমার নায়ক হয়ে উঠলেন। সেদিন ময়মনসিংহে উনার কুন্ডু প্যাথলজিতে চাকুরী করা আমার বন্ধু বাপ্পি একজন রোগী নিয়ে ঢাকায় আসছিলো, তাই সারাদিন নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোডে ঈদের কেনাকাটা করে ক্লান্ত আমি বন্ধুর সাথে দেখা করার জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলাম। সন্ধ্যার পর বাপ্পি এলো, সাথে ছোট এক বাচ্চা সহ স্বামী--স্ত্রী দুজন। ধানমন্ডি পপুলারে ডাক্তার দেখাতে দেখাতে রাত ১১ টা বেজে গেলো। বন্ধুর আত্মীয় বলে আমি ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করছিলাম। গভীর রাতে একসাথে খাওয়াদাওয়া করে উনাদের সিএনজিতে তুলে ভাড়া দিয়ে যখন মিরপুরের বাসে চড়ে বসলাম, তখনই জানলাম উনারা বাপ্পির কেউ হয় না। তাহলে বাপ্পি কেন তাদের নিয়ে ঢাকায় এসেছে? উত্তর- কুন্ডু স্যার পাঠিয়েছে। তারা কী কুন্ডু স্যারের আত্মীয়? উত্তর- না, স্যার উনাদের চেনেও না। তাহলে স্যার কেন তাদের চিকিৎসার জন্য ঢাকা পাঠিয়েছে? উত্তর- দরিদ্র রোগী এবং উনাদের বাড়ি চাটমোহর তাই। একবার ভেবে দেখুন, একজন ডাক্তার নিজ এলাকার দরিদ্র রোগী বিধায় ভিজিট নিলেন না, এটাই হয়তো একজন ডাক্তারের উদারতার উদাহরণ হবার যোগ্য। কিন্তু কুন্ডু স্যার কি করেছিলেন? উনার ওখানে চিকিৎসা সম্ভব না তাই ঢাকায় উনার পরিচিত এক ডাক্তারের কাছে চিঠি লিখে রেফার করলেন। উনাদের যাতায়াত, খাওয়া খরচ দিয়ে উনার অফিসের এক স্টাফকে সাথে দিয়ে দিলেন। পাঠক, কথাটাকে অন্য ভাবে নেবেন না। সেই রোগী পরিবারটি ছিলো মুসলিম। হিন্দু ধর্মালম্বী হলে না হয় সংশয়বাদী মন এ যুক্তি খুঁজতো যে, ধর্মীয় টানে উনি এমনটা করেছেন! নির্মোহ বিশ্লেষনে, আত্মীয় নন, পরিচিত নন, নিজ ধর্মের নন অথচ নিজ এলাকার এক দরিদ্র রোগীর জন্য উনার পাশে থাকার এই চেষ্টা আমাকে মুগ্ধ করেছিলো। সে সন্ধ্যাতেই উনি আমার নায়কে পরিনত হয়েছিলেন। বিভিন্ন সময়ে উনার অফিস স্টাফ বাপ্পির কাছ থেকে উনার সম্পর্কে যা শুনেছি, নায়ক নয় বরং উনার স্থানটা মহানায়কের। তাই বাপ্পিকে আমি অসংখ্যবার বলেছি, এমন একজন মহৎ মানুষের সাথে জীবনে একবার হলেও দেখা করতে চাই। উনার সাথে একবার দেখা করার জন্য হলেও আমি ময়মনসিংহ যাবো। কিন্তু আমার সে সৌভাগ্য এখনো হয়ে ওঠেনি। করোনাকালে জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের বাহিরে চাটমোহরে সর্বোচ্চ ত্রান সহায়তা দিয়েছেন উনি। চাটমোহরের বিভিন্ন মন্দিরে উনার অনুদানের ফলক দেখা যায়। ময়মনসিংহে চাটমোহরের রোগী গেলে কুন্ডু প্যাথলজিতে বড় রকমের অর্থছাড় তো বটেই, ক্ষেত্র বিশেষে ফ্রি এমনকি থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এসবই হয় প্রচারের আড়ালে। এমনকি উনি এতটাই প্রচারবিমুখ যে, চাটমোহরে করা উনার কাজগুলো বাস্তবায়নে ফটোসেশনের জন্য উনি আসেন না। চাটমোহরের মানুষ উনার নাম জানে, উনাকে ভালো ডাক্তার হিসাবে চেনে, উনার দানের খবরও রাখে কিন্তু উনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, এ খবরটাই চাটমোহরের অনেকে জানেন না! ৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় একজন চিকিৎসক হিসেবে ময়মনসিংহ অঞ্চলের সীমান্তবর্তী একাধিক যুদ্ধক্ষেত্রে এবং ভারতের বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্বপালন করেছিলেন। (ঐতিহাসিক কামালপুর যুদ্ধ, ভারতের মেঘালয়ের ঢালু ক্যাম্পে, তেলঢালাতে বেঙ্গল রেজিমেন্টের হেড কোয়ার্টারে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন)। ১৯৭২ সালে তিনি মুক্তিযোদ্ধা সনদ পান। এটা খুবই দুঃখজনক যে, জাতির এক সূর্যসন্তান, একজন স্বনামধন্য চিকিৎসক, চাটমোহরের অসহায় মানুষের এক অকৃত্তিম বন্ধু, প্রচারের আড়ালে থাকা একজন দানবীরকে আমরা খুবই কম জানি। চাটমোহরে উনারমত মানুষকে আয়োজন করে সংবর্ধনা দিলে তাতে চাটমোহরবাসীই সন্মানিত হতো। তা সম্ভবত এত বছরেও হয়ে ওঠেনি। তবে চাটমোহরের এক তরুনের হৃদয়ে উনি নায়ক হয়ে আছেন। চাটমোহরের অসংখ্য অসহায় মানুষের হৃদয়ে উনি সহায় হয়ে আছেন। মানুষের হৃদয়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কাছে জাগতিক সংবর্ধনা অতি তুচ্ছ এক ব্যাপার।

SHARE THIS

Author:

Previous Post
Next Post