সেঞ্চুরিয়নের বিশাল রিসোর্টটিকে স্বর্গের এক টুকরো ছবি বললেও খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে না। সবুজের সমারোহের মধ্যে শুয়ে আছে শান্ত লেক। খুব ভালো করে খেয়াল করলে দূরের গলফ কোর্সের কার্টগুলোকে হয়তো আপনি গুটি গুটি পায়ে চলতে দেখবেন। তবে সেটি স্বর্গীয় নিস্তবদ্ধতায় কোনো শব্দতরঙ্গ ভাসিয়ে আনে না। এখানে আবহসংগীত হয়ে বাজে শুধুই পাখির কলতান।সেঞ্চুরিয়ন–জোহানেসবার্গ মিলিয়ে তিন ওয়ানডের সিরিজে বাংলাদেশ দলের আবাস প্রকৃতির মায়াভরা এই রিসোর্ট, যেটি আসলে ব্যস্ত জীবন থেকে ছুটি নিয়ে কয়েকটা দিন নিরিবিলি থাকারই জায়গা। বাংলাদেশের আগে সর্বশেষ দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ভারতীয় দলেরও ঠিকানা ছিল এখানেই। কিন্তু কাল সেই নিস্তরঙ্গ আবহেই ভর করল একটা চাপা অস্বস্তি। বিশাল সবুজ লনের এখানে–ওখানে সাজানো কফি টেবিলগুলোয় বসে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে নীরব উত্তেজনা। মুঠোফোনে এখানে–ওখানে যোগাযোগ, টাচ স্ক্রিনে আঙুলের ব্যস্ততায় অনুসন্ধানের চেষ্টা—কী হচ্ছে? কী হতে চলেছে শেষ পর্যন্ত?অস্বস্তির শুরুটা পরশু রাত থেকে, যখন ঢাকা–জোহানেসবার্গ–সেঞ্চুরিয়নের
বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল একটা দুঃসংবাদ। সাকিব আল হাসানের মা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে, অসুস্থ তাঁর স্ত্রী–সন্তানেরা, অসুস্থ শাশুড়িও। পরিবারের এমন ক্রান্তিলগ্নে সাকিব কি তাহলে ফিরে যাবেন দেশে! পরিবারের চেয়ে নিশ্চয়ই খেলাটা বড় নয়।স্বর্গের কোলে থেকেও কাল তাই নিজেকে সবকিছু থেকে নির্বাসনে রাখলেন সাকিব। প্রকৃতির এমন নির্জনতায়ও মাথার ওপর অনন্ত চাপ। মনের মধ্যে অশান্তির বাষ্প। সর্বক্ষণ ঢাকায় যোগাযোগ, মা–শাশুড়ি কেমন আছেন? সন্তানেরা ভালো আছে তো?সাকিব আইপিএলের জন্য ছুটি চান, বিশ্রামের জন্য ছুটি চান—এসব নিয়ে হাজারটা সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু মা–সন্তান যখন হাসপাতালের শয্যায়, তখন তো সবকিছু ফেলে সেখানেই ছুটে যাওয়া উচিত। কাল সাকিবকে নিয়ে ওই অনিশ্চয়তার মধ্যে অধিনায়ক তামিম ইকবাল তো বলেই দিলেন, ‘আমার পরিবারের এই অবস্থা হলে আমি এক্ষুনি দেশে ফিরে যেতাম।’ সাকিবের সহমর্মী টিম ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদ, নির্বাচক হাবিবুল বাশারও। পরিবারের এমন দুঃসময়ে তাঁর দেশে ফিরে যাওয়াটাই স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল দুই অগ্রজের কাছে।সাকিবের শাশুড়ি দুরারোগ্য ক্যানসারে আক্রান্ত, হাসপাতালের বিছানায় তিনি পার করছেন জটিল সময়। ঠান্ডাজনিত সমস্যায় মা আগে থেকেই হাসপাতালে। এরপর ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত বড় সন্তানের হাসপাতালে ভর্তির খবর শুনে প্রথম ওয়ানডেতে ব্যাট করতে নামেন সাকিব, যখন ব্যাটিং করছিলেন তখন হাসপাতালে নিতে হয় আরেক সন্তানকে। হাসপাতাল পর্যন্ত যেতে না হলেও অসুস্থ সাকিবের স্ত্রী শিশির এবং ছোট সন্তানও।দেশ থেকে অবশ্য পরশু রাতেই সাকিব খবর পেয়েছেন মা ও সন্তানদের শারীরিক অবস্থা উন্নতির দিকে। তবে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁর শাশুড়িকে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে যেতে পারলে ভালো হয়। চিকিৎসকদের অনুমতি পেলে হয়তো পরিবার সে উদ্যোগ নেবেও। সে ক্ষেত্রে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাবেন সাকিবের স্ত্রী শিশির। সন্তানেরা থেকে যাবে ঢাকায়। আর তাদের দেখভালের জন্য সাকিবকে তখন বাধ্য হয়েই দেশে ফিরতে হবে। কিন্তু শাশুড়ির শারীরিক অবস্থা এখনো অতটা ভালো নয় যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ বিমানভ্রমণের ঝক্কি নিতে পারবেন। তাহলে সিদ্ধান্ত কী, সাকিব ঢাকায় ফিরে যাবেন, নাকি দলের সঙ্গে থেকে যাবেন দক্ষিণ আফ্রিকাতেই?