কোয়াড বাইক তৈরি করে দেখালেন চাটমোহরের সুমিত

 চাটমোহর পৌর শহরের সোনাপট্টি এলাকার সন্দ্বীপ জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী সন্দ্বীপ কর্মকার ও তার স্ত্রী জয়ন্তী রানী কর্মকারের বড় ছেলে সুমিত কর্মকার শোভন। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট)-এর শিক্ষার্থী তিনি। মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের সুমিত শুধু চাটমোহর নয়, নিজের আবিষ্কার দিয়ে পুরো দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। সুমিত ও তার দলের সদস্যরা দুর্গম পথে চলাচলের জন্য ‘কোয়াড বাইক’ আবিষ্কার করে দেখিয়ে দিয়েছেন স্বপ্ন ও চেষ্টা থাকলে সবকিছুই সম্ভব। তার আবিষ্কৃত চার চাকার এই বাইক বাংলাদেশের অটোমোবাইল জগতে এ ধরনের প্রথম উদ্ভাবন। তাই এই আবিষ্কারের মূল অবদানটা সুমিত ও তার দলের।

ছোটবেলায় খেলনা গাড়ি ভেঙে আবার তৈরি করাই যার নেশা ছিল, সেই সুমিত আজ ‘টিম ক্র্যাক প্লাটুন-এর ক্যাপ্টেন। আর ছেলের এই সাফল্যে বাবা-মায়ের চোখে আনন্দাশ্রু। চাটমোহরের এই কৃতীসন্তান পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি ও স্কলারশিপ পান। এরপর চাটমোহর আরসিএন অ্যান্ড বিএসএন পাইলট মডেল স্কুল ও কলেজ থেকে গোল্ডেন-এ প্লাস পেয়ে ২০১০ সালে এসএসসি পাস করে ভর্তি হন ঢাকার নটর ডেম কলেজে। সেখান থেকে ২০১২ সালে এইচএসসি পাস করে একই বছরে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে কয়েকজন সহপাঠীকে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘টিম ক্র্যাক প্লাটুন’। সেই টিমের সদস্যরা মিলে তৈরি করেন পাহাড়ি রাস্তা ও দুর্গম পথে চলাচলের জন্য ‘কোয়াড বাইক’। যার এখন বিশ্বব্যাপী একটি নাম। “শূন্য থেকে শুরু করেছিলাম। ‘কোয়াড বাইক’ কি তা প্রথম দিকে মানুষকে বোঝাতে বহু কষ্ট হয়েছে। কারণ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বাইকের ধারণা ছিল অনেকটাই নতুন। শেষ পর্যন্ত নিজেদের একাগ্র প্রচেষ্টা আর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় আমরা তা বানাতে সক্ষম হয়েছি। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ নামের গেরিলা যোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ওই সময় কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিল। এ জন্য মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে আমাদের টিমের নামও ক্র্যাক প্লাটুন রাখা হয়েছে। আমাদের লড়াই হচ্ছে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত করা।” এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে এভাবেই দৃঢ়কণ্ঠে কথাগুলো বলেন উদ্ভাবনের নেশায় বিভোর ক্র্যাক প্লাটুনের টিম লিডার সুমিত কর্মকার।

সুমিত আরো বলেন, ‘আমরা কাজ শুরু করেছি ফর্মুলা কার নিয়ে। এটা বানিয়ে আমরা প্রতিযোগিতা করব জাপানে বিশ্বের অন্যান্য সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে, ফর্মুলা স্টুডেন্ট জাপানের ইভেন্টে। ফর্মুলা স্টুডেন্ট হচ্ছে বিশ্বের সব দেশ থেকে আসা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ফর্মুলা কার বানানোর সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা। ফর্মুলা কার হলো ফর্মুলা ওয়ান কারের আদলে তৈরি করা এক সিটের প্রোটোটাইপ রেসিং কার। বিভিন্ন দেশে এটার আয়োজন হয়, সেখানে দেশ-বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে টিম আসে। আমরা বাংলাদেশকে সেখানে নিয়ে যেতে চাই, প্রথমবারের মতো আমরা এ রকম একটা কাজ করতে যাচ্ছি।’ এভাবেই তাদের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন সুমিত।

তবে এর আগে সুমিত ও তার দলের অন্য সদস্যরা বাইকটি বানানোর পর গত বছরের ২২ অক্টোবর ভারতের তামিলনাড়–তে অনুষ্ঠিত কোয়াড বাইক ডিজাইন চ্যালেঞ্জে ক্র্যাক প্লাটুনের টিম অংশ নেয়। সঙ্গী ছিল তাদের তৈরি ‘কোয়াড বাইক’টি। প্রতিযোগিতায় ২৩ ফাইনালিস্টের সঙ্গে লড়াই করে ষষ্ঠ হয় সুমিত ও তার দল।

সুমিত কুমার আরো জানান, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম থেকে চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ও রুয়েটের 



দুইজন ফ্যাকাল্টি অ্যাডভাইজরের (অনুষদ উপদেষ্টা) সহযোগিতায় তারা দশজন মিলে প্রায় তিন মাসের প্রচেষ্টায় কোয়াড বাইকটি তৈরি করেছেন। গবেষণা পর্যায়ে থাকায় তাদের এই বাইকটি বানাতে খরচ হয়েছে দুই লাখ টাকা। বাইকটিতে একটি দেশি কোম্পানির ১৫০ সিসির মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। ৬০ কিলোমিটার বেগে তাদের তৈরি কোয়াড বাইকটি পাহাড় বা দুর্গম অঞ্চলের মাটির রাস্তায় চলতে পারবে। এতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চারটি চাকা লাগানো হয়েছে। দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে রুয়েটের মেশিন শপেই তৈরি করা হয়েছে এটি।

আজকের এই অবস্থানে আসার পেছনে কার ভূমিকা জানতে চাইলে সুমিত বলেন, ‘সবার ভালোবাসায় আজ আমরা এ পর্যায়ে। বিশেষ করে বাবা-মা এবং প্রসূন কুন্ডু, অলোক কুন্ডু, বিজয় ভৌমিক ও অপূর্ব কুন্ডু স্যারদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আজ আমি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, এর সবকিছু তাদের জন্য। আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।’

সুমিতের এই সাফল্যে সবচেয়ে বেশি খুশি তার মা জয়ন্তী রানী কর্মকার। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই সুমিতের জানার আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। তাকে সেভাবেই মানুষ করেছি। কোনো সময় তাকে পড়ার কথা বলতে হয়নি। তবে প্রতিবেশী অনিতা পিসি তাকে গড়ে তুলেছিলেন একজন মেধাবী ছাত্র হিসেবে। মূলত তার হাতেই ছিল সুমিতের হাতেখড়ি।’

সুমিতের বাবা সন্দ্বীপ কর্মকার বলেন, ‘আমি ছেলেকে ডাক্তার বানাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ছেলের ইচ্ছা ছিল সে ইঞ্জিনিয়ার হবে। আমরা তার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়েছি।’


SHARE THIS

Author:

Previous Post
Next Post