পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক : দারিদ্র্য বিমোচনই মূল লক্ষ্য
পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক : দারিদ্র্য বিমোচনই মূল লক্ষ্য স্থায়ীভাবে দেশ থেকে দারিদ্র্য দূর করার লক্ষে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগ ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ পরিবর্তিত নাম ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্পের কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় বিশেষায়িত পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের। ‘পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আইন, ২০১৪ (২০১৪ সালের ৭নং আইন) এর আওতায় ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ব্যাংকটির প্রথম ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে দায়িত্ব পালন করছেন খন্দকার আতাউর রহমান। এর আগে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের পরিচালক এ দায়িত্ব পালন করেন। ছয় মাসের দায়িত্ব পালনে কোনো কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন, দীর্ঘ ৩৪ বছরের অভিজ্ঞাকে কিভাবে কাজে লাগিয়ে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকটিকে একটি মর্যাদাসম্পন্ন ব্যাংক হিসেবে তৈরি করবেন, এছাড়া ব্যাংকটিকে এগিয়ে নিতে আগামীর পরিকল্পনা কী- ভোরের কাগজের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় এসব বিষয়ে কথা বলেছেন বিচক্ষণ এ এমডি। বিস্তারিত জানাচ্ছেন মরিয়ম সেঁজুতি- ভোরের কাগজ : অন্য বাণিজ্যিক বা বিশেষায়িত ব্যাংক থেকে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আলাদা। তাই এর মূল বিশেষত্ব সম্পর্কে জানতে চাই? খন্দকার আতাউর রহমান : দারিদ্র্য বিমোচনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগ ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ পরিবর্তিত নাম ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্পের কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায়ে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আইন অনুযায়ী ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল সুবিধাবঞ্চিত পল্লী এলাকার দরিদ্র মানুষদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করা। সর্বোপরি নিজের ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও ব্যাংকের পুঁজি সহায়তায় নানামুখী উৎপাদনশীল কার্যক্রম, বিপণন ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন ক্ষুধামুক্ত দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করাই ব্যাংকের মূল লক্ষ্য। ভোরের কাগজ : আপনি এ ব্যাংকে যোগ দেয়ার পর কী কী পরিবর্তন এনেছেন? সেক্ষেত্রে কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে? খন্দকার আতাউর রহমান : অন্য অনেক ব্যাংকের চেয়ে এ ব্যাংকের আকার বড়, জনবলও বিশাল। বর্তমানে মোট ৪৯০ টি শাখা রয়েছে সারা দেশে। এতগুলো শাখা নিয়ে আর কোনে বিশেষায়িত ব্যাংক নেই। প্রায় ১১ হাজার জনবল নিয়ে ব্যাংকটি চলছে। এটাই প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে মনে হয়। এছাড়া যেহেতু প্রকল্প থেকে রূপান্তরিত ব্যাংক, ফলে এখানে চ্যালেঞ্জগুলো একটু অন্য ধরনের। প্রকল্পে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম সবক্ষেত্রে অনুসরন করা হয় না। অস্থায়ীভিত্তিতে লোক নিয়োগ করা হয়েছে। সে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সমস্যা প্রশমিত করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, আমাদের কোনো অডিট ছিল না। কিন্তু যেকোন বানিজ্যিক ব্যাংকের কাজের পিছনে পিছনে অডিট থাকে। এখানে তেমন কোন অডিট ছিল না। আমি যোগ দেয়ার পরে একটি অডিট টিম গঠন করলাম। আমার জানা দরকার ছিল, এতগুলো টাকা এখানে বিনিয়োগ করা হয়েছে, সে টাকাগুলো কি অবস্থায় রয়েছে। আরো একটি বিষয় হচ্ছে- ১১ হাজার জনবল হলেও সবাই মাঠ পর্যায়ে কাজ করে। কর্মকর্তার সংখ্যা খুবই কম। অর্থাৎ সুপারভিশন যারা করবে তারা নেই বললেই চলে। এখানে সিনিয়র অফিসার হচ্ছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এরপর একজন জি এম রয়েছেন। এরপরের অবস্থানেই ব্যবস্থাপনা পরিচালক। মাঝে কোন গ্যাপ নেই। আমি আসার পরে ১৮ টি অডিট টিম তৈরি করেছি। এ পর্যন্ত ২৩৭টি শাখায় অডিট সম্পন্ন হয়েছে। বাকিগুলো চলমান রয়েছে। অডিট করতে গিয়ে যেসব অনিয়ম উঠে এসেছে সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করছি। টাকা আদায় করে যে সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকে জমা দিতে হয়, এ ধারণা প্রকল্পের লোকজনের মধ্যে নেই। অডিট চলাকালীন আমরা প্রচুর টাকা আদায় করতে পেরেছি। এ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়া ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ব্যাংকের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং রূপকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিকৃতি স্থাপন এবং বঙ্গবন্ধু কর্ণার প্রতিষ্ঠা করা, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় দিবস ও উৎসব পালনের কার্যক্রম গ্রহণ, কর্মকর্তা কর্মচারীদের কর্মস্পৃহা বাড়ানো ও শারীরিক/মানসিক প্রশান্তির জন্য খেলাধূলার মাধ্যমে শরীর-মন ভালো রাখা এবং কাজে মনযোগ বাড়ানো এবং ব্যাংকের প্রচার-প্রসারে ভূমিকা পালনের লক্ষ্যে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক ক্লাবের আওতায় একটি দাবা দল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যা দাবা ফেডারেশনে রেজিস্ট্রশন করা হয়েছে। চলতি বছর প্রথম বিভাগ দাবা লীগে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক দাবা ক্লাব অংশ নিবে। ভোরের কাগজ : গ্রাহকদের কি কি সেবা দিচ্ছেন? খন্দকার আতাউর রহমান : প্রতিটি গ্রামে ব্যাংকের উদ্যোগে গ্রাম সমিতি গঠন করে সমিতির সদস্যদের দৈনিক সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করা এবং আত্মকর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ঋণ ও এসএমই ঋণ প্রদান করাই ব্যাংকের প্রধান কার্যক্রম। সমিতির বিশেষত্ব হচ্ছে প্রতিটি সমিতিতে ৬০ জন সদস্যদের মধ্যে ন্যূনতম ৪০ জন মহিলা সদস্য। এ যাবত এরকম প্রায় এক লক্ষ বিশ হাজার সমিতি ব্যাংকের উদ্যোগে গঠিত হয়েছে যার সদস্য সংখ্যা প্রায় সাতান্ন লক্ষ। অর্থাৎ এই ১ লক্ষ ২০ হাজার সমিতির ৫৭ লক্ষ পরিবার সরাসরিপল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের সেবা গ্রহণ করে উপকৃত হচ্ছেন। সঞ্চয়ী সেবার মধ্যে আছে ৩, ৫ ও ১০ বছর মেয়াদী পল্লী পেনশন স্কীম যেখানে মুনাফার হার ৭%, স্টুডেন্টস সেভিংস স্কীম বা স্কুল ব্যাংকিং যেখানে স্কুলিংকে উৎসাহিত করার জন্য মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয়েছে হিসাবধারী ছাত্র-ছাত্রীদের পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি এবং এইচএসসিতে প্রাপ্ত সিজিপিএর উপর অর্থাৎ প্রাপ্ত সিজিপিএর দ্বিগুন হারে মুনাফা প্রদান করা হয়। আর আছে সঞ্চয়ী হিসাব যা আবশ্যিকভাবে সমিতির প্রত্যেক সদস্যকে সঞ্চয়ের জন্য খুলতে হয়। এখানে আকর্ষণীয় মুনাফা দেয়া হয়। ঋণ সেবার মধ্যে আছে ক্ষুদ্র ঋণ, এস এমই-ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ঋণ যার মেয়াদ এক বছর। ঋণের সিলিং পঁচিশ হাজার থেকে দুই লাখ পঞ্চাশ হাজার পর্যন্ত। এছাড়া আছে স্বল্প মেয়াদী শস্যগোলা ঋণ যার মেয়াদ ৩ থেকে ৬ মাস। কোভিড-১৯ এর প্রভাব মোকাবেলায় পল্লী এলাকার উৎপাদন সেবা এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য সরকার ঘোষিত প্যাকেজের আওতায় বিশেষ কর্মসৃজন ঋণ। পল্লী এলাকায় এম্বুলেন্স ক্রয় অথবা যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্যে যানবাহন ক্রয়ের জন্যও ঋণ সুবিধা প্রদান করা হয়। আমরা সুদের কথা বলিনা। আমরা সেবার বিপরীতে নামমাত্র সেবামূল্য নিয়ে থাকি যার হার ৪% থেকে ৮% এর মধ্যে। বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের সকল দরিদ্র গ্রাহক পল্লী এলাকায় বসবাস করেন যাদের পক্ষে উপজেলায় এসে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করা অসুবিধাজনক তাই ব্যাংকের সেবা এইসব গ্রাহকদের দোরগোড়ায় পৌছে দেয়ার লক্ষ্যে ব্যাংক মোবাইল ফোন ভিত্তিক ডিজিটাল আর্থিক সেবা “পল্লী লেনদেন” চালু করেছে। ২০২০ সালের ২৬ জানুয়ারি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্স এর মাধ্যমে “পল্লী লেনদেন” এর কার্যক্রম আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ভোরের কাগজ : এ পর্যন্ত কি পরিমান ঋণ বিতরণ করেছেন? মোট আমানতের পরিমাণ কত? খন্দকার আতাউর রহমান : শুরু থেকে এযাবৎ পর্যন্ত যদি বলি তাহলে প্রায় বিশ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে যার উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি। অথাৎ এক কোটি দরিদ্র মানুষ নিজেদের স্বাবলম্বী করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন প্রকার ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহণ করেছে। ২০২০-২১ অর্থ বছরের শেষে ঋণ স্থিতি দাড়িয়েছে ৭ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা। বিশেষায়িত নন-সিডিউল ব্যাংক হওয়ায় আপামর জনসাধারণের কাছ থেকে এ ব্যাংকের আমানত সংগ্রহের সুযোগ নেই। শুধুমাত্র ব্যাংকের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত গ্রাম সমিতির সদস্য এবং তাদের পরিজনদের আমানত ব্যাংক সংগ্রহ করে থাকে। ২০২০-২১ অর্থ বছরের সংগৃহীত আমানতের স্থিতি ২,৭৬৯ (দুই হাজার সাতশত ঊনসত্তর) কোটি টাকা। ভোরের কাগজ: ব্যাংক নিয়ে ভবিষৎ পরিকল্পনা কি? খন্দকার আতাউর রহমান: পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক একটি বিশেষায়িত ব্যাংক। এটি কোন বাণিজ্যিক ব্যাংক নয় এবং বানিজ্যের উদ্দেশ্যে এ ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। একটি মহান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং হতদরিদ্র মানুষকে দারিদ্রসীমা থেকে মুক্তি দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আইন অনুযায়ী প্রজেক্টের উত্তরসূরী হিসেবেই এ ব্যাংক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে ব্যাংকের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। এসব সীমাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে আমি স্বল্প মেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী একটি পরিকল্পনা তৈরী করেছি যেখানে আপাতত ব্যাংকে পরিচালন ব্যয় সংকুলানের জন্য আগামী ৫ বছর সরকারি বরাদ্দের প্রস্তাব করা এবং দারিদ্র বিমোচন খাতে বাজেটে ব্যাংকের নামে দীর্ঘমেয়াদী বরাদ্দের প্রস্তাব করা যাতে এ বরাদ্দকৃত অর্থ পল্লীর বিপুল সংখ্যক দরিদ্র এবং দারিদ্রসীমা থেকে উঠে আসা মানুষদের আত্মকর্মসংস্থানে বিনিয়োগ করে তার আদায়কৃত অর্থ পুনঃবিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংক নিজের সামর্থে পরিচালিত হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে পর্যায়ক্রমে দরিদ্র মানুষের জীবন মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখা। একজন মানুষের দারিদ্র বিমোচনই শুধু নয় তাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে সামর্থবান হিসেবে তৈরি করে ক্ষুদ্র থেকে ছোট, ছোট থেকে মাঝারী, মাঝারী থেকে বৃহৎ উদ্যোক্তায় পরিণত করা। ফলে দারিদ্র বিমোচনের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরী হবে। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক গ্রামের লক্ষ কোটি মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।